ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!

ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক, জাতীয়, প্রবাস, শিরোনাম, সর্বশেষ-সংবাদ

Posted: January 31, 2020 at 3:39 pm

ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!-Digital Khobor

ওমানে আরবাব (ওমানি স্পন্সর) যেন সোনার হরিণ, আরবাব যদি ভালো হয়, তাহলে কপাল খুলে যায়, আর আরবাব যদি খারাপ হয়, তাহলে প্রবাস জীবন হয়ে যায় নরকের জীবন, এমনটাই বলেছেন ওমান প্রবাসীরা। প্রচন্ড গরম, কাজের সংকট, দেরিতে বেতন, দালালদের প্রতারণা, এয়ারপোর্টে হয়রানী, পাসপোর্টে ভোগান্তি- এতো সব অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই প্রবাসজীবন বেছে নিতে পছন্দ করেন। বর্তমান সাড়া বিশ্বে প্রায় দেড়কোটি বাংলাদেশী প্রবাসী জীবন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে বেশীরভাগই মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রমিকবান্ধব দেশ ওমানের বিভিন্ন জায়গায় বর্তমানে প্রায় ৮ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন।

দেশের শ্রমশক্তির বড় একটি বাজার এখন ওমান। মাস্কাট, সালালাহ, সোহার, ‘ইবরি’ ও ‘মাসিরাহ’, ‘বুরাইমি’ সহ ওমানের প্রায় সকল স্থানেই রয়েছে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বসবাস। দেশটিতে বেশিরভাগ শ্রমিক ফ্রি ভিসায় এসে চাকুরী করে। ওমানের রাজধানী মাস্কাটের রুইতে অবস্থিত এক জায়গার নাম হামরিয়া। এখানে বেশিরভাগই বাংলাদেশি। অনেকেই এই স্থানকে ওমানের দ্বিতীয় বাংলাদেশ বলে ডাকে। কারণ, এখানের শতকরা নব্বই ভাগই বাংলাদেশী। বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, কসমেটিক্স, সহ ছোটখাটো ব্যবসা গুলো বাংলাদেশীদের হাতেই। এখানে প্রতিদিন শ্রমিকরা নতুন কাজের সন্ধানে আসেন। আবার অনেকে কাজের সন্ধানে ভিসা নিয়ে এলেও পুলিশের চেকিংয়ে পড়ে গ্রেফতার হয়।

বিশেষ করে শুক্রবার দিন পুলিশ বেশি চেকিং করে থাকে। সম্প্রতি ওমানের বেশ কিছু অঞ্চলে দেশটির লেবার কোর্টের চেকিং এ প্রায় চার শতাধিক বাংলাদেশী গ্রেফতার হয়। ওমানের রুইতে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা করছেন চট্টগ্রামের নাসির হোসেন, ওমানের সার্বিক অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রায় চল্লিশ বছর যাবত ওমানে আছি, এখানে আগে ব্যবসা বাণিজ্য অনেক ভালো থাকলেও এখন আগের মতো তেমন ব্যবসা বাণিজ্য নাই। প্রবাসীরাও আগের মতো শান্তিতে নাই। কাজ কাম অনেক কমে যাচ্ছে, অনেক কোম্পানি শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছেনা সময়মতো। প্রথমে চাকরি এরপর ব্যবসা করছি। বর্তমানে এ ব্যবসা থেকে যা আয় হচ্ছে তা আগের তুলনায় কম। কোনোরকম দিন চলে যাচ্ছে।

ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!-Digital Khobor
প্রবাসী ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের নাসির হোসেন

এদিকে মাস্কাটের আল-খোয়ের শহরে দীর্ঘ ১৪বছর যাবত স্ক্রাবের ব্যবসা করেন ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম, ওমানের সার্বিক বিষয় নিয়ে তিনি আমাদের বলেন, ওমানে ব্যবসা করতে হলে যাদের আরবাব (ওমানি স্পন্সরকে আরবাব বলে) ভালো, তাদের কপাল ভালো, তারা চাইলেই ওমানে বৈধ সকল কাজ এমনকি ব্যবসা বাণিজ্য ও করতে পারে। কখনও আইনগত সমস্যা হলে, আরবাব থানায় গিয়ে টাকা পয়সা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু যাদের আরবাব খারাপ, তাদের জন্য প্রবাস জীবন হয়ে যায় নরকের জীবন। প্রতিমাসে ১০ থেকে ২০ রিয়াল (১ রিয়ালে বাংলাদেশী ২২১ টাকার সমান) করে আরবাব কে ফায়দা (কমিশন) দিতে হয়, আবার দুইবছর পর পতাকা (রেসিডেন্স কার্ড) রি-ইস্যু করতে ২০০ থেকে ৩০০ রিয়াল পর্যন্ত ফায়দা দিতে হয়। এভাবে যা আয় হয়, সবই আরবাব কে কমিশন দিয়ে দিতে হয়। আবার কোনো সমস্যা হলে তার থেকে কোনধরনের সহযোগিতা তো পাওয়াই যায়না, বরং অনেক আরবাব সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সরাসরি এয়ারপোর্টে নিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয় অপ্রস্তুত অবস্থায়।

এক কথায় আরবাব ভালো হলে সব ভালো, নইলে প্রবাস ছেড়ে দেশে ফিরে আসতে হয়। তাই বলতে গেলে আরবাবের হাতেই থাকে অনেকের ভাগ্য। তবে সব আরবাব খারাপ না বলেও জানান এই দুই প্রবাসী। সাঈফ বলেন, আমার আরবাব যথেষ্ট ভালো। অনেকে তো কর্মী হিসেবে এখানে এসে মেহনত করে এখন বিরাট ব্যবসায়ীও হয়েছেন। তেমন এক ব্যবসায়ীর নাম হাজী আব্দুল করিম। বর্তমানে ওমানের ইবরি শহরে রয়েছে তার হাইপার মার্কেট, রেস্টুরেন্ট, বিল্ডিং মেটারিয়ালস সহ বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ইবরি শহরের এমন কোনো ওমানি নাই, যে নাকি বাংলাদেশী এই ব্যবসায়ীকে চিনেনা। ছোট্ট ওমানি বাচ্চা থেকে ৭০বছরের বয়স্ক ওমানি নাগরিক এক নামেই তাকে চিনে। বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে এই হাজি করিমের। ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজ করার কল্যাণেই মূলত তার এমন পরিচিতি। একজন মানুষের যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র সবই রয়েছে তার হাইপার মার্কেটে।

ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!-Digital Khobor
প্রবাসী ব্যবসায়ী হাজি আব্দুল করিমের হাইপার মার্কেট

সোহারের ভিলেজ হাইপার মার্কেটের জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ চৌধুরী বলেন, আগে দুবাইতে একটা হাইপার মার্কেটের জিএম ছিলাম, সেখান থেকে আমাকে বর্তমান কোম্পানির মালিক আমাকে ওমানে নিয়ে এসেছে। ওমানের সবকিছু ভালো, এখানে ট্রাফিক নিয়ম বেশ কড়া। আমার নিজের গাড়ি রয়েছে। প্রায়ই সোহার থেকে মাস্কাট যাওয়া লাগে, নিজেই ড্রাইভ করে যাই। কোনো ধরণের ট্র্যাফিক জ্যাম নাই এবং কোনো ধরণের শব্দ দূষণ ও নাই। সবমিলিয়ে ওমান বেশ ভালোই লাগে আমার কাছে।

ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!-Digital Khobor
ভিলেজ হাইপার মার্কেটের জেনারেল ম্যানেজার ইউসুফ চৌধুরী

তবে ওমানে পাবলিক পরিবহনের বড়ই অভাব। সাধারণত নিজের গাড়ী নিয়েই সবাই চলাফেরা করে, যাদের অবস্থা একটু ভালো, তারা শুরুতেই গাড়ী কিনে ফেলেন। কারণ ওমানে ব্যক্তিগত গাড়ী এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যতীত আপনি কোনো ভাবেই ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবেননা। কারণ দেশটিতে বাংলাদেশের মতো এমন যাতায়াত ব্যবস্থা নাই। এখানে বাস সার্ভিস হিসেবে শুধুমাত্র মাওয়াসালাত কোম্পানির কিছু সিটি বাস রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে আপনি শহরের নির্দিষ্ট কিছু স্থানে যেতে পারবেন।

ওমানে আরবাব যেন সোনার হরিণ!-Digital Khobor
সুলতান কাবুস ষ্ট্রীট

আর এই অভাবে বড় ধরনের অসুবিধায় পরতে হয় ওমানে পর্যটকদের। কারণ সেখানে রেলপথ নেই, তেমন কোনো লোকাল বাসও নেই। যাতায়াতের জন্য পর্যটকদের একমাত্র ট্যাক্সিই ভরসা। এছাড়া রিক্সা, সিএনজি বা মটর সাইকেল সেবা এসব কোনো কিছুই নেই। দেশটিতে যাতায়াতের জন্য ট্যাক্সি অথবা পাবলিক বাসে চড়েই আপনাকে যাতায়াত করতে হবে। একারণে দেশটিতে যাতায়াত খরচ তুলনামূলক বেশি পড়ে।

বাইজিদ আল-হাসান, 

ad

spellbitsoft

YOUTUBE-DIGITAL-KHOBOR

আর্কাইভ

%d bloggers like this: