মধ্যপ্রাচ্যে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু এখন সময়ের দাবি

ক্যাটাগরি: জাতীয়, প্রবাস, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিরোনাম, সর্বশেষ-সংবাদ

Posted: January 22, 2020 at 3:01 pm

মধ্যপ্রাচ্যে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু এখন সময়ের দাবি-Digital Khobor

মধ্যপ্রাচ্যে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় চালু এখন সময়ের দাবি


বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীদের জন্যে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শাখা চালুর দাবিটি দীর্ঘদিনের, দীর্ঘ সময়ের। নিজেদের চাহিদা উল্লেখ করে বিভিন্ন সময় পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই দাবি তুলে ধরতে দেখা গেছে প্রবাসীদের। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ধীরে ধীরে আরো জোরালো হয়ে উঠছে প্রবাসীদের এই দাবি। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ধীরেসুস্থে সরকারও উদ্যোগ গ্রহণ করছে বলা যায়। যার দু-একটি বাস্তবায়ন চিত্রও দৃশ্যমান। এখন চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে আরো বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়ার সময় এসে গেছে আমাদের। এটি এখন সময়ের দাবি।

উন্নত দেশগুলোতে কর্মরত অল্প শিক্ষিত বা অসম্পূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করা প্রবাসীরা অন্তত এই সুযোগটি ভালভাবেই কাজে লাগাতে পারবে। একদিকে যেমন নিজের পড়ালেখা বা শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ করতে পারবে অন্যদিকে প্রতিযোগিতার বাজারে নিজের যোগ্যতা যাচাইয়ে একটি বড় সুযোগ পাবে তারা। কারণ শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ করতে পারলে এসব শ্রমিকদের যেমন যোগ্যতা ও জানার পরিধি বাড়বে তেমনি বাড়বে কর্মস্থলে পদোন্নতির সুযোগ। যার সরাসরি লাভ উঠাতে পারবে দেশের অর্থনীতি।

এই বিষয়টি সকলেরই জানা, বাংলাদেশ থেকে শতকরা সত্তর ভাগ শ্রমিক নিজের শ্রম বিক্রি করতে পরবাসে যায় একেবারেই খালি হাতে। ভাষা জ্ঞানের স্বল্পতা, অদক্ষতা ও শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকার তালিকায় প্রথম দিকেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের নাম। যদিও বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে প্রচার আছে- এশিয়ান শ্রমিকদের মধ্যে সবচে কম মজুরিতে শ্রম বিক্রি করে বাংলাদেশি শ্রমিক।

অনেকে মনে করেন এর অন্যতম কারণই হচ্ছে- অদক্ষতা, স্বল্প শিক্ষা ও ভাষা জ্ঞানের অভাব। যেকারণে মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রায় সর্বত্র শ্রমবাজারে রাজ করছে ভারত, চীন ও ফিলিপাইনের মত দেশগুলোর শ্রমিক। এই তালিকায় নাম তুলতে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে নেপাল। এসব দেশের শ্রমিকরা নূন্যতম ভাষা জ্ঞান ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্যে কারিগরি দক্ষতা নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমান। যার ইতিবাচক ফলাফল হিসেবে ওরা তাদের মান অনুযায়ী ভাল কর্মসংস্থানে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে সহজে । বেতনও পায় মানসম্মত।
কিন্তু আমরা কেন পিছিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর খুবই সহজে ধরা পড়ে এখানে। যদিও জীবিকার সন্ধানে পরবাসে ঠাঁই খুঁজে নেওয়া বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা বর্তমানে প্রায় সোয়া কোটি। দেশ স্বাধীনের পর থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ ও সংসারের হাল ধরতে আমাদের এই যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তির চিন্তায় টগবগে তরুণ-যুবকরাই প্রতিনিয়ত লাইন ধরছে পরবাসের। যাদের বেশির ভাগই লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে বিদেশে চলে যান।

সেখানে একজন অদক্ষ কর্মী হিসেবে শুরু করতে হয় প্রবাসের ব্যস্ততা ও বাস্তবতার জীবন। সময়ের সাথে দক্ষতা অনুযায়ী কারো কারো বাড়ে মূল্যায়ন। তবে ভাষা জ্ঞানের অভাবে অনেকেই থেকে যায় পূর্বের অবস্থানে। বলতে গেলে- কারিগরি দক্ষতা, ভাষা জ্ঞান এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পরবাসে। কিন্তু আমরা এই তিনটির সবক’টি ছাড়াই দেশ ত্যাগ করি। যার উদাহরণ রয়েছে ভুরি ভুরি। নিয়মের দড়ি টেনে অনেকে সময় পার করেন দশ কিংবা বিশ বছর।

এরপর একজন প্রবাসী যখন দেশে ফিরে যান তখন দেশেও তার আর কোনো চাকরি করার সুযোগ থাকে না। যার অন্যতম কারণ ওই অসমাপ্ত পড়ালেখা বা সার্টিফিকেট বিহীন ঝুলি। অথচ একজন পড়ালেখা করা কর্মী বা শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন চাকরি প্রত্যাশী ব্যক্তি যেকোনো ভাল কর্মসংস্থান পাবার সুযোগ যেমন প্রবাসে থাকে তেমনি ফিরে গেলে দেশেও কোনো না কোনোভাবে এই সুযোগ নিতে পারেন তারা।

মূলত, হঠাৎ করে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়া একজন যুবক যখন পরদেশে পা রাখেন, নামের পাশে যোগ করেন ‘প্রবাসী’ বিশেষণ তখনই বুঝতে পারেন, দেশে আরেকটু পড়ালেখা করা প্রয়োজন ছিল। আরো দুই-একটি সার্টিফিকেট অর্জন করা যেত। যেসময় এ চিন্তা মাথায় কাজ করে, তখন আর সুযোগ ফিরে আসে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের হিসাব করি। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় সাত লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস। এসএসসি পাস বা এইচএসসি অধ্যয়নরত অবস্থায় আমিরাতে পা রাখা কর্মীর সংখ্যা নেহাৎ কম নয়, যারা এমন তাড়নায় ভোগেন প্রতিনিয়ত। আবার কেউ কেউ দু-দন্ড পার করলেও ভাল একটি ডিগ্রির অভাবে পদোন্নতি থেকে পিছিয়ে পড়ছেন বছরের পর বছর। নিঃসন্দেহে তাদের মধ্যে নতুন করে পড়ালেখার ইচ্ছা ও আগ্রহ জন্মায়। জন্মানোটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অভাবে স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হয় না। যদিও বর্তমানে অনলাইনে পড়ালেখা ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, পৃথিবীর নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়ছেনও। কেউ কেউ আবার উচ্চতর ডিগ্রির জন্যে প্রবাসে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। যদি বাংলাদেশ সরকারের অধীনস্থ কোনো ট্রেনিং সেন্টার বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকে তাহলে চিত্রটি কেমন হবে ?

নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ! আদতে এই জন্যেই প্রবাসে কর্মজীবীরা পুনরায় পড়াশোনার এমন ইচ্ছা ও আগ্রহ যাচাই করতে গিয়ে বারবার উঠে আসছে বাংলাদেশ সরকারের অধীনস্থ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখার চালুর কথা। গত কয়েকবছর ধরেই এই দাবিটির কথা ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যাচেলর অব আর্টস (বি.এ)-এর সনদপত্র অর্জনের সুযোগ উন্মুক্ত করার পর আরো একটু নড়েচড়ে বসেন প্রবাসীরা। সময়ের চাহিদার কথা দু-চার লাইনে আবারও লিখতে শুরু করেন তারা।

সম্প্রতি খবর প্রকাশিত হলো এবার সৌদি আরব প্রবাসীরাও এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারবেন। দেশটিতে থাকা দূতাবাসের অধীনে সৌদিতে কি পরিমাণ শিক্ষার্থী আছে তার সম্ভবতা যাচাইয়ের জন্য সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছে রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। সেই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোতে এবার খুব জোরদার হয়ে উঠেছে প্রবাসীদের জন্যে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে শাখা চালুর দাবি। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েতের প্রবাসীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের এই দাবির কথা জানান দিচ্ছেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসীদের কথাই যদি বলি, বর্তমানে সৌদি আরবের পরপরই রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এরা। বহিঃর্বিশ্বে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যেও এই দেশটিতে থাকা প্রবাসীদের অবস্থান দ্বিতীয় বলা চলে। যেহেতু সৌদি আরবে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভবতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে এটি চালু করা হচ্ছে সেই বিবেচনায় হলেও দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশ আমিরাতে এটি চালু করা এখন সময়ের দাবি।

আবার বাংলাদেশি কমিউনিটির শক্তিশালী অবস্থানের প্রেক্ষিতেও এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখানে চালু করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে কমিউনিটি যেমন সমৃদ্ধ হবে সে অনুপাতে বাড়বে দেশেরও সুনাম। তবে স্থান নির্ধারণ করা নিয়ে দেশটিতে কিছুটা জটিলতা যে থাকবে না তাও কিন্তু নয়। বাণিজ্যিকভাবে স্থান নির্ধারণ করতে গেলে খরচের তালিকাও লম্বা হবে। সেক্ষেত্রে বর্তমানে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাওয়া শারজা বাংলাদেশ সমিতির ভবন, আবুধাবি বা রাস আল খাইমাস্থ বাংলাদেশ স্কুলের ভবন নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

প্রসঙ্গক্রমে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি করে শাখা চালু করা গেলে প্রবাসে কর্মজীবীদের মধ্যে নতুন করে পড়ালেখার আগ্রহ জন্মাবে। ফলাফল হিসেবে বাড়বে যোগ্য-কর্মীর সংখ্যা। কারণ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান হলে অনেক প্রবাসী ছুটির দিনেও পড়ালেখার সুযোগ পাবেন। তখন এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলেও রাখবে জোরালো ভূমিকা।

শুধু তাই নয়, বিশ্বের সমৃদ্ধশালী দেশগুলোর মধ্যে যোগ্য ও দক্ষ শ্রমিকের যে প্রতিযোগিতা চলছে সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকরাও পাল্লা দিতে পারবে আপন যোগ্যতায়। আবার প্রবাসে একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে বহুমুখী লাভ। যেমন- প্রবাসে বিভিন্ন ব্যাংক ও ভাল ভাল প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন, এক্সিকিউটিভ লেবেলে রয়েছেন এমন কর্মীর সংখ্যা কম নয়। এরা চাইলে ছুটির দিনে ট্রেনিং গ্রহণের মাধ্যমে খুব সহজে একটি ডিগ্রি কোর্স করে নিতে পারেন। এটি কর্মক্ষেত্রে পদন্নোতিরও দারুণ সুযোগ করে দিবে। এছাড়া দেশে দেশে এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান থাকলে দেশীয় সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি দূতাবাসের সেবাগুলো আরো সহজে দেওয়া সম্ভব হবে। আলাদা সুযোগ-সুবিধা বাড়বে প্রবাসীদের, কমে আসবে ভোগান্তি।

লেখক : কামরুল হাসান জনি
সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রবাসী সাংবাদিক 

Mujib Borsho

ad

spellbitsoft

YOUTUBE-DIGITAL-KHOBOR

আর্কাইভ

February 2020
SSMTWTF
« Jan  
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
29 
%d bloggers like this: