ওমানে কড়া নজরদারিতে বাংলাদেশীরা

ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক, জাতীয়, প্রবাস, শিরোনাম, সর্বশেষ-সংবাদ

Posted: December 4, 2019 at 12:23 pm

ওমানে কড়া নজরদারিতে বাংলাদেশীরা-Digital Khobor

ওমানে কড়া নজরদারিতে বাংলাদেশীরা। সম্প্রতি ওমান বাংলাদেশ ফুটবল ম্যাচের নিউজ কভার করতে ওমান যেয়ে এমন চিত্র নজরে পরে বাংলাদেশী সংবাদকর্মীদের। দৈনিক নয়া দিগন্তের রিপোর্টার রফিকুল হায়দার ফরহাদ ওমান থেকে ফিরে তুলে ধরেন ওমানে বসবাসরত বাংলাদেশীদের আসল চিত্র। 

 

‘রিজেন্ট এয়ারওয়েজে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ওমানের মাস্কাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ। এরপর ইমিগ্রেশন পার হয়ে একটু এগোতেই ওমান পুলিশের এক কর্মকর্তার প্রশ্ন ‘তুমি কি ভারতীয়?’। উত্তরে আমি না বলে জানালাম বাংলাদেশী। তখন আমার প্রতি নির্দেশ, ‘ওই লাইনে দাঁড়াও।’ আমাকে যে লাইনে দাঁড় করানো হলো সেখানে আগ থেকেই অপেক্ষমাণ শত শত বাংলাদেশী।

অন্য দিকে ভারতীয়দের লাইনে নেই কোনো ভিড়। তারা দ্রুতই বের হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কড়া চেকিং বাংলাদেশীদের। তাদের সাথে থাকা প্রতিটি ব্যাগ খুলে সব কিছু তল্লাশি করা হচ্ছে। একটু দেরি করলেই কর্কশ ভাষা ওমানিদের।

কেন এমন করা হচ্ছে জিজ্ঞেস করতেই ওমানের জাতীয় পোশাক পরা এক তল্লাশিকারীর আরবি ভাষায় জবাব, ‘মুশকিল’, ‘মুশকিল’। মানে সমস্যা আছে। আমার সামনের এক প্রবাসী ব্যাগে করে পান নিয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই পান রেখে দেয়া হলো। এভাবে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন পণ্য ব্যাগ তল্লাশি করে রেখে দিচ্ছিল ওমানি পুলিশ ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা। আমার বেলায়ও সমান তল্লাশি।

ব্যাগে থাকা ওষুধের প্যাকেট এবং শেভিং সরঞ্জামে চোখ ছিল তাদের। অবশ্য দ্রুতই আমার পর্ব শেষ করে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। ততক্ষণে আমার প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়ে গেছে। এর আগে আঙুলের ছাপ এবং বড় বড় চোখ করে ছবি নেয়ার জন্যও ঘণ্টা-খানেক পার হয়ে যায়।

কেন বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে এত কড়া নজরদারি। একই বিমানে মাস্কাট যাওয়া এক বাংলাদেশী জানালেন, বাংলাদেশীরা ইয়াবাসহ নানান ধরনের মাদকদ্রব্য ওমানে নিয়ে যান। তিন-চার বছর আগে এই অপকর্মের সূত্রপাত। এই নিষিদ্ধ পণ্য বহন করে ধরাও পড়েছেন বাংলাদেশীরা। তাই এত কড়া তল্লাশি। ইমিগ্রেশন পার এবং সব ব্যাগ স্ক্যান করার পরও কেন এই তল্লাশি।

ওমানে চাকরি করা এক বাংলাদেশী প্রবাসী এই নিয়ে প্রশ্ন করতেই তাকে প্রথম কাতারের সিরিয়াল থেকে জোর করে ঠেলে পেছনের সারিতে নিয়ে আসা হয়। এরপর পুলিশের পোশাক পরা একজন এসে তাকে কিছুক্ষণ শাসাতে থাকে। বেচারা এই তরুণ ভয়ে আর কথা বলেননি।

৩৫ বছর ধরে ওমানে আছেন ব্যবসায়ী চট্টগ্রামের নাসিরুদ্দিন। তিনি জানালেন এই তল্লাশি শুধু বাংলাদেশীদের জন্যই। এরা সাথে করে মাদকদ্রব্য বহন করে। তাই তাদের বিশেষভাবে চেকিং করা হয়। এই শ্রেণীর বাংলাদেশীদের জন্য ওমানে বাংলাদেশী প্রবাসীদের মারাত্মক দুর্নাম হচ্ছে।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে ওমানে বাংলাদেশীদের যাওয়া শুরু কর্মসংস্থানের জন্য। আশির দশকে এই হার ব্যাপক হয়। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ এই দেশে ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ বাংলাদেশী চাকরি করছেন। প্রথম দিকে বেশ সুনাম ছিল বাংলাদেশীদের; কিন্তু পরবর্তীতে কিছু দালালের কারণে এবং হাল আমলে এই মাদক বহনের জন্য বাংলাদেশীরা সম্মান হারিয়েছেন।

ওমানে কাজ করা বাংলাদেশীদের ৯৫ শতাংশই নিম্ন শ্রেণীর শ্রমিক। ভবন নির্মাণ, বাগানে কাজ করা, বাসাবাড়ি বা অফিসে ক্লিনিংয়ের কাজ তাদের। রেস্টুরেন্টেও কাজ করেন অনেক বাংলাদেশী। আমি মাস্কাটের বাওশারের যে ওয়েসিস হোটেলে ছিলাম সেখানেও কর্মরত আছেন আট বাংলাদেশী।

ভারতীয়দের সাথে পাল্লা দিয়ে সেই হোটেলের রিসিপশনেও কাজ করছেন চট্টগ্রামের কায়সার। ওমানসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যেই যেকোনো প্রতিষ্ঠানে অফিসারের কাজ করে ভারতীয়রা। আর বাংলাদেশীরা শ্রমিক। ফলে এদের বেতনও কম।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাস্কাটে কর্মরত বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা থেকে যাওয়া এক ডাক্তার জানান, যদি বাংলাদেশ সরকার লেবারদের পাশাপাশি শিক্ষিত ও দক্ষ লোক পাঠাতো ওমানসহ অন্য দেশে, তা হলে বেতন আরও বেশি পেতেন বাংলাদেশীরা। এতে বাংলাদেশীদের অবস্থানও আরও উন্নত হতো। তার মতে, সাধারণ শ্রমিকরা মাসে ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল বেতন পান।

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে টেকনিক্যাল হ্যান্ড এলে তারা ৮০০ থেকে ১০০০ রিয়াল পর্যন্ত মাসে বেতন পেতেন। প্রসঙ্গত, ১ ওমানি রিয়াল সমান ২২০ টাকা। অবশ্য বাংলাদেশী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বেশ কয়েকজনের সাথে দেখা হয়েছে ওমান-বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ কভার করতে গিয়ে। এরা বেশ ভালো আছেন। পরিবার নিয়েই থাকছেন। হাঁকাচ্ছেন দামি গাড়ি। এদেরই তিনজনের গাড়ির সার্ভিস পেয়েছি আমরা বাংলাদেশী সাংবাদিকরা।

২০১২ সালে বাংলাদেশ থেকে ডাক্তার নেয় ওমান সরকার। তখন প্রায় দেড় শ’ বাংলাদেশী ডাক্তারের চাকরি হয় সেখানে। বাংলাদেশী ডাক্তারদের দারুণ সুনাম ওমানে। তাই পরে আরও বাংলাদেশী ডাক্তার নেয়ার পরিকল্পনা নেয় ওমান সরকার। ঢাকায় আসেন ওমান স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সাথে বনিবনা না হওয়ায় তারা আর বাংলাদেশ থেকে কোনো ডাক্তার নেয়নি। ঝুঁকে পড়ে শ্রীলঙ্কার ডাক্তারদের দিকে।

ফলে এখন শ্রীলঙ্কার বিপুল-সংখ্যক ডাক্তার কর্মরত সেখানে। প্রথমে মিসরীয় ডাক্তারদের চাহিদা ছিল ওমানে। পরে সুযোগ এসেছিল বাংলাদেশী ডাক্তারদের। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নষ্ট হলো সেই সুযোগ। অবশ্য ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু কিছু বাংলাদেশী ডাক্তার এখন চাকরি নিচ্ছেন ওমানের চিকিৎসালয়গুলোতে।

প্রথম যখন বাংলাদেশ থেকে ডাক্তাররা ওমানে যান ওই ডাক্তারদের দেখে বিশ্বাসই হচ্ছিল না ওমানিদের জানান বাংলাদেশী ওই ডাক্তার। তার দেয়া তথ্যমতে ওমানিরা ভাবতেই পারেননি বাংলাদেশেও ডাক্তার আছেন। কারণ তাদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশী মানেই শ্রমিক।

দালালের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হওয়া আর মাদক বহনের দুর্নাম ছাড়া ওমান প্রবাসী বাংলাদেশীদের বেশ সুনাম। তারা কোনো কাজে ‘না’ করেন না। মানে তাদের যখনই কাজ করতে বলো হোক না কেন, তারা সম্মতি দেন। যে আচরণ পাওয়া যায় না শ্রীলঙ্কা ও ভারতীয়দের কাছ থেকে। তাই বাংলাদেশীদের খুব পছন্দ করেন ওমানের জনগণ, জানালেন ব্যবসায়ী নাসিরুদ্দিন।

তিন লাখ টাকা ব্যয় করে ওমানে যান বাংলাদেশীরা। অথচ এর অর্ধেকে ওমানে যাওয়া যায়। কিন্তু দালালদের কারণে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এর পরও প্রতারিত তারা। তাদেরকে বলা হয় বেতন বেশ ভালো দেয়া হবে। অথচ ওমানে পৌঁছার পর শুরু হয় প্রতারণা এক কাজের কথা বলে অন্য কাজে লাগানো হয়। আর বেতন মাসে ১০০ থেকে ১৫০ রিয়াল। টাকায় যা ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। এ নিয়েই তাদের চলতে হচ্ছে। দেশে যে তাদের টাকা পরিশোধের বিষয় আছে। তা ছাড়া পুরো পরিবার যে তাদের উপার্জনের দিকেই তাকিয়ে।

এই দালালদের একজনকে বছর কয়েক আগে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল ভুক্তভোগী প্রবাসী বাংলাদেশীরা জানান, মাস্কাট প্রবাসী কুষ্টিয়ার আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমান নিজেও প্রতারণার শিকার। বাংলাদেশী দালাল মামুন সহ আরও ৩০ থেকে ৩৫ জন বাংলাদেশীর সাত মাসের বেতনের টাকা মেরে দেশে পালিয়ে এসেছে। ওমানি মুদ্রায় এই অর্থ ৮০ হাজার রিয়ালের কাছাকাছি। টাকায় যা এক কোটি ৭৬ লাখ টাকা। মামুনের বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছায়।

ওমানে কিছু বাংলাদেশী অতি লোভে পড়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছেন বলে জানা গেছে। এরা এক মালিকের অধীনে কাজ করতে ওমান যান। পরে আরও বেশি টাকার জন্য সেই মালিক ছেড়ে অবৈধ হিসেবে অন্য মালিকের অধীনে কাজ নেন। এতে তাদের টাকা উপার্জন ভালোই হয়। কিন্তু তারা কোনো বিপদে পড়লে নতুন মালিক আর কোনো দায়িত্ব নেন না।

আর বিপদে পড়েন অবৈধভাবে মাছ ধরতে গিয়ে। এই অবৈধ কাজে তাদের উপার্জন ভালো হলেও তাদের দেশে ফিরতে হয় নিজের টাকায়। তা ছাড়া নানা ঝামেলা। অথচ তারা একটু ধৈর্য ধরে বৈধভাবে পুরনো মালিকের অধীনে কাজ করলে সব সুযোগ সুবিধাই পেতেন।

বাংলাদেশীদের ওপর বিরক্ত হয়ে মাসকাটস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কনসুলার মোহাম্মদ নাহিদুল ইসলাম জানান, ‘বাংলাদেশীরা তো নিজেরা প্রতারিত হতে পছন্দ করেন। এরা বেশি টাকার লোভে পুরনো মালিকের কাজ ছেড়ে নতুন মালিকের কাজ করেন অবৈধভাবে। এ কাজের জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে ওমানি রিয়াল দিতে হয় তার নতুন মালিককে। এই নতুন মালিকরাই বেঈমানিটা বেশি করেন।’

 

 

রফিকুল হায়দার ফরহাদ, ওমান থেকে ফিরে

spellbitsoft

YOUTUBE-DIGITAL-KHOBOR

আর্কাইভ

January 2020
SSMTWTF
« Dec  
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
%d bloggers like this: